আরেক সাহেদ প্রতারক ‘সিরাজুল আমিন রুমেল’-এর গল্প

742
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সাথে সেলফিবাজ সিরাজুল আমিন রুমেলের ছবি তার ফেসবুকে ভাসছে
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সাথে সেলফিবাজ সিরাজুল আমিন রুমেলের ছবি তার ফেসবুকে ভাসছে

রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান প্রতারক সাহেদ করিমের মত মুখোশধারি আরও একজন সাহেদের খোঁজ পাওয়া গেছে। কথিত ইনফিনিটি গ্রুপের সিইও সিরাজুল আমিন রুমেলের বিরুদ্ধে অসংখ্য প্রতারণার খবর পাওয়া যাচ্ছে। যিনি একাধারে মানবপাচার, এমএলএম কোম্পানির মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া, বেসিক ব্যাংক থেকে ৬৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা ফেরত না দেয়া, অর্থ আত্মসাৎ, পারিবারিক, ব্যবসায়িক ও বন্ধুদের চেক জালিয়াতি করেছেন।

তিনি নিয়মিত ইয়াবা সেবন করেন। টাকা পাচার করেন দেশের বাইরে। পাচার করা টাকায় ২০১৯ সাল পর্যন্ত মালায়শিয়াতে ৮টি বাড়ি কিনেছেন। তার প্রতিষ্ঠানের নারী কর্মীদের নানান সময় অনৈতিক প্রস্তাবনা দেয়ার বিষয়টি অনেকটা টপসিক্রেট।

সাহেদের মতই রাজনৈতিক নেতাদের সাথে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে নিজের ক্ষমতা দেখানোর কাজটিও করে থাকেন নিয়মিত। নিজেকে মেজর জেনারেল ও প্রধানমন্ত্রীর কাছের মানুষ পরিচয় দিয়ে হুমকি-ধমকি দিয়ে স্বার্থ উদ্ধার করে থাকেন। কেউ তার বিরোধিতা করলে টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতন করে থাকেন। এমন নানান অভিযোগে তার নামে সারাদেশে অন্তত ২৩টি মামলা হয়েছে।

পুলিশের ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে এভাবেই ফেসবুকে ছবি দিয়ে নিজেকে জাহির করেন সিরাজুল আমিন রুমেল
পুলিশের ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে এভাবেই ফেসবুকে ছবি দিয়ে নিজেকে জাহির করেন সিরাজুল আমিন রুমেল

সম্প্রতি সময়ে দেখা গেছে সিরাজুল আমিন রুমেল সাবেক মন্ত্রী মীর্জা আজম ও সিএমপির পুলিশ কমিশনার মাহবুবুর রহমানের নাম পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন জায়গা থেকে সুবিধা নিয়েছেন। মানবপাচার ও এমএলএম ব্যবসার ক্ষেত্রে তিনি এই দুটি নাম সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন।

রুমেলের দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে মানবপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার কাছেও তথ্য রয়েছে। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর র্যাব তাকে গ্রেফতার করে ৬ মাসের জন্য জেলহাজতে পাঠালে সে জামিন নিয়ে বাইরে চলে আসে।

এরপর দৈনিক যুগান্তরের অপরাধ বিভাগের প্রধান ও বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী নান্নুর স্ত্রী শাহিনা হোসেন পল্লবীর কথিত কর্মস্থলের (ইনফিনিটি মার্কেটিং লিমিটেডের) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সিরাজুল আমিন রুমেলের নাম উঠলে তিনি আবারও আলোচনায় চলে আসেন। পুলিশ তাকে খুঁজছে। রুমেল এখন পলাতক রয়েছেন।

রুমেল নিজেকে ইনফিনিটি গ্রুপের সিইও হিসেবে নিজের পরিচয় দিলেও মূলত এই নামে কোনো অফিশিয়াল কাগজপত্র নেই। নিজের মুখে বলা নাম দিয়েই ভিজিটিং কার্ডে একটি গ্রুপের সিইও পরিচয় দিচ্ছেন। কিন্তু সরকারি খাতায় এই নামের কোনো অস্তিত্ব নেই। সে মূলত বিদেশে লোক পাঠানোর জন্য নিজের আখওয়ান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামের কোম্পানি ও নিজের এমএলএম কোম্পানি ইনফিনিটি মার্কেটিং লিমিটেড দিয়েই টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছেন। তবে তার কোম্পানিগুলোর ট্যাক্স ফাইল ঠিক না থাকার বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সম্প্রতি তার নামে অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলামের সাথে সিরাজুল আমিন রুমেল
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলামের সাথে সিরাজুল আমিন রুমেল

বহুমুখী এই প্রতারক বাইরের মানুষের পাশাপাশি নিজের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও প্রতারণা করেছেন। বাবা নূরুল আমিনের নাম ব্যবহার করে বেসিক ব্যাংক থেকে ৬৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে নিজেই আত্মসাৎ করেছে। এসব টাকা দিয়ে মালায়শিয়াতে ৮টি বাড়ি কিনেছেন। বাবার রিক্রুটিং এজেন্সি এভিয়েট ইন্টারন্যাশনালের কোটি কোটি টাকার চেক জালিয়াতি করেছেন। এসব বিষয়ে বাবা কথা বলতে গেলে গত ১৫ জুলাই বাবাসহ পরিবারের সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা করে। হামলার এসব ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে।

পরিবারের সদস্যরা বলছেন, সিরাজুল আমিন রুমেল ইয়াবা সেবন করে উত্তেজিত হয়ে বাসায় হামলা করেছে এবং বাসার অনেক দামি আসবাবপত্র ভাংচুর করেছে। এ ঘটনা পরবর্তী রুমেলের বাবা নূরুল আমিন বাদী হয়ে ১৭ জুলাই গুলশান থানায় মামলা করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রুমেলের পরিবারের এক সদস্য এই প্রতিবেদককে বলেন, সিরাজুল আমিন রুমেল সাহেদ করিমের চেয়েও ভয়ঙ্কর। তার বিষয়ে অনুসন্ধান করলে সাহেদের মতো প্রতারকদের নিষ্পাপ মনে হবে। যত দ্রুত সম্ভব তাকে গ্রেফতার করে মামলাগুলোর বিষয়ে তদন্ত করার জন্য তিনি অনুরোধ করেন।

আরও পড়ুন: 

‘সাংবাদিক নান্নু হত্যার পিছনে মাস্টারমাইন্ড ছিলেন রুমেল’

সিরাজুল আমিন রুমেলের বাবা-ভাই সবাই মানবপাচার ব্যবসায়ী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here