সিরাজুল আমিন রুমেলের বাবা-ভাই সবাই মানবপাচার ব্যবসায়ী

787
Sirajul-Amin-Rumel-সিরাজুল আমিন রুমেল
সিরাজুল আমিন রুমেল

বাবা নূরুল আমিন আর ছেলে সিরাজুল আমিন রুমেল মিলে বাংলাদেশের বৃহত্তম মানবপাচার চক্রের ব্যবসা করছে। এই চক্রের বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশে একাধিক মামলা রয়েছে। বাংলাদেশেস্থ রিক্রোটিং এজেন্সি এভিয়েট ইন্টারন্যাশনালের মালিক আদম ব্যাপারী নূরুল আমিন এবং আখওয়ান ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক নূরুল আমিনের পুত্র সিরাজুল আমিন রুমেলের প্রতারণার জালে আটকে প্রবাসে গিয়ে সর্বস্ব হারিয়ে এখন পাগল প্রায় অনেকেই।

সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত সহস্রাধিক শ্রমিকরা বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ করেছে। বিক্ষোভের সময় সেদেশের পুলিশ তাদেরকে ঘেরাও করে রাখে। পাসপোর্টসহ সব ধরনের সার্বিক সহযোগিতা না পাওয়ায় অতিষ্ঠ হয়ে শ্রমিকরা এ পথ বেছে নিয়েছে। বিক্ষোভকালে শ্রমিকরা প্ল্যাকার্ড ধারণ করে কমিশন ও দালাল-এজেন্টের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিতে থাকে। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত কয়েক হাজার অবৈধ শ্রমিকের বৈধ হওয়ার স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে পিতা-পুত্রের খপ্পরে পড়ে।

বাংলাদেশেস্থ রিক্রোটিং এজেন্সি এভিয়েট ইন্টারন্যাশনালের মালিক আদম ব্যাপারী নূরুল আমিন এবং আখওয়ান ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক নূরুল আমিনের পুত্র সিরাজুল আমিন রুমেলের প্রতারণার জালে আটকে এসকল শ্রমিক সর্বস্ব হারিয়ে এখন পাগল প্রায়। মালয়েশিয়া সরকার ঘোষিত ৬পি প্রোগ্রামের আওতায় বৈধ পারমিট করে দেওয়ার কথা বলে এই চক্র ৪/৫ হাজার বাংলাদেশী শ্রমিকের অন্তত ৮০ থেকে ৯০ লাখ রিঙ্গিত হাতিয়ে নেয়। বাংলাদেশী টাকায় যার পরিমাণ ২২ কোটি থেকে ২৫ কোটি টাকা।

মালয়েশিয়া সরকার দফায় দফায় বৈধ হওয়ার সময় বাড়ালেও এই প্রতারক চক্র শ্রমিকদের বৈধ হওয়ার কোন ব্যবস্থা নেয় নাই। বরং যতবার সময় বাড়িয়েছে ততবার তারা শ্রমিকদের কাছ থেকে নানা অজুহাতে অতিরিক্ত টাকা আদায় করেছে। বৈধ হওয়ার চূড়ান্ত সময় সীমা শেষ হওয়ার পর, এখন আর এ সকল শ্রমিকের বৈধ হওয়ার রাস্তা খোলা নেই এবং দেশে ফেরত যাওয়ার কোন উপায় নেই কারণ এর মধ্যে সাধারণ ক্ষমার আওতায় বিনা জরিমানায় দেশে ফেরত যাওয়ার সময় সীমাও শেষ হয়েছে। এখন এদের জেল জরিমানা অনিবার্য। এমতাবস্থায় সব কিছু হারিয়ে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে দিশাহারা হয়ে পড়েছে এ সকল হতভাগ্য প্রবাসী শ্রমিক।

শ্রমিকদের কাছ থেকে জানাযায়, ১ আগস্ট ২০১১, থেকে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অবৈধ বিদেশী শ্রমিকদের বৈধ করন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ দেশের সরকার ঘোষিত ৬পি প্রোগ্রাম প্রথম ধাপ ছিল ফিঙ্গার প্রিন্ট রেজিস্ট্রেশন বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে দুই হাতের দশ আঙ্গুলের চাপ দিয়ে অবৈধ শ্রমিকদের কে তালিকা ভুক্ত করতে মালয়েশিয়ান কিছু আউটসোর্সিং কোম্পানি ও কর্মসংস্থান কোম্পানিকে মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশন থেকে বিশেষ ফিঙ্গার প্রিন্ট মেশিন সরবরাহ করে। সুচতুর নূরুল আমিন ও তাঁর বড় ছেলে সিরাজুল আমিন রুমেল মিলে আউটসোর্সিং কোম্পানি শ্রী জয়া পেকাসাস এবং ফ্রেমকো থেকে ১০টি মেশিন ভাড়া নিয়ে অবৈধ শ্রমিকদের রেজিস্ট্রেশন শুরু করে। সরকার নির্ধারিত ৩৫ রিঙ্গিত ফি এর স্থলে তারা শ্রমিকদের থেকে ৩৩৫ রিঙ্গিত আদায় করে।

উল্লেখ্য যে, সিরাজুল আমিন রুমেল ২০০৭ এর কলিং এর পর মালয়েশিয়াতে তিনটি কোম্পানি গড়ে তোলেন। গত বছর আগস্টে অবৈধ শ্রমিক রেজিস্ট্রেশন শুরুর ২/৩ মাস আগ থেকে নুরুল আমিন কয়েক দফা মালয়েশিয়ায় এসে প্রতারণার পরিকল্পনা করতে থাকে এবং সেই পরিকল্পনা মোতাবেক দুইটি আউট সোর্সিং কোম্পানিকে নিজেদের কোম্পানি দাবি করে শ্রমিকদের মাঝে বাংলা লিফলেট, পোষ্টার এবং বিভিন্ন স্থানে ব্যানার টাঙ্গিয়ে দেয়। এই কাজে তার বড় ছেলে রুমেলকে সার্বক্ষণিক সহায়তার জন্য তাঁর অপর ৪ ছেলে (১) বদরুল আমিন রাকিব (২) রাশেদ (৩) জাহেদ (৪) ফজলুল আমিন জাবেদ এবং তার দীর্ঘ দিনের কু-কর্মের সহযোগী চট্টগ্রামের জাফকে মালয়েশিয়ায় নিয়া আসে।

নুরুল আমিন নিজে সার্বক্ষণিক উপস্থিত থেকে কোতারায়া কমপ্লেক্সে অবস্থিত আখওয়ান ট্রাভেলস এন্ড ট্যুরস এ ফিঙ্গার প্রিন্ট তত্ত্বাবধান করেন। সিরাজুল আমিন রুমেল তাঁর আখওয়ান মেনেজম্যান্ট এবং আখওয়ান রিসোর্সের ৭৪-২, জালান পুত্রি ৫/১, বান্দার পুত্রি পুচং, সেলাংগুর অফিসে ফিঙ্গার প্রিন্ট তত্ত্বাবধান করেন। অন্যান্য দের কে জহুর বারু, পেনাং ,ইপু ও মালাক্কায় পাঠিয়ে শ্রমিকদের ফিঙ্গার প্রিন্ট করানো হয়। এই পিতা পুত্র প্রতারক চক্র নিজেদের কে আউটসোর্স কোম্পানির মালিক দাবী করে এবং পরবর্তীতে আউটসোর্স কোম্পানির অধীনে পারমিট করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শ্রমিকরে নিকট হতে অতিরিক্ত ফি আদায় করতে থাকে।

এর পর ১ সেপ্টেম্বর ২০১১, থেকে নতুন পাসপোর্ট বানানোর জন্য জন প্রতি ৩০০-৫০০ রিঙ্গিত আদায় করতে থাকে। যেখানে বাংলাদেশ হাইকমিশন নির্ধারিত ফি মাত্র ১০২ রিঙ্গিত। শ্রমিকেরা পার্স পোর্ট বানানোর জন্য অতিরিক্ত অর্থ দিতে আপত্তি জানালে, তারা বলে তোমরা এখন আমার লোক যদি আমার কথা মত কাজ না কর তা হলে সকলের ফিঙ্গার প্রিন্ট বাতিল করে দেব। সহজ সরল বহু শ্রমিক তাদের হুমকিতে ভয় পেয়ে তাদের অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে দেয়।

আবার বহু শ্রমিক তাদের কষ্টের টাকা প্রতারকদের হাতে না দিয়ে, তারা নিজ নিজ পাসপোর্ট এর জন্য বাংলাদেশ হাইকমিশনে আবেদন করে। কিন্তু এই প্রতারক চক্র বাংলাদেশ হাইকমিশনে সেই সময় কর্মরত কিছু অসাধু খণ্ড কালীন কর্মচারীর সাথে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নুরুল আমিন পুত্র জাবেদ, জহেদ, এবং নুরুল আমিনের সহযোগী জাফর হাইকমিশন থেকে সেই সকল পার্স পোট নিজেদের কবজায় নিয়ে জোর পূর্বক শ্রমিকের পারমিটের টাকা দিতে বাধ্য করে। এই ভাবে ধীরে ধীরে সহজ-সরল শ্রমিকেরা এই চক্রের জালে আটকা পড়তে থাকে।

অউটসোর্সিং কোম্পানির নামে পারমিট করার কথা বলে টাকা আদায় করলেও এই প্রতারক চক্র জানতো যে, মালয়েশিয়াতে অউটসোর্সিং কোম্পানির অধীনে কোন পারমিট দেওয়া হবে না। এই পরিস্থিতি নুরুল আমিনের পরামর্শে সিরাজুল আমিন রুমেল তাঁর অফিসের গাড়ী চালক মালায়ু মোস্তফা বিন হোসাইন ও গাড়ী চালকের স্ত্রীর নামে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১১, এই দিনে নতুন চারটা ভুয়া কোম্পানি খোলে ওই সকল শ্রমিকদের পারমিট করার জন্য।

ভুয়া ৪টি কোম্পানি হলো- 1. PAYUNGMAS CLEANING SERVICE SDN.BHD, 2. LADANG GEMILANG MAJU SDN.BHD, 3. PERTANIAN & LANSKAP HIJAUAN SDN.BHD, 4. AGENSI PERKERJAN TENAGAKERJA SDN.BHD

প্রসঙ্গত, নূরুল আমিনের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে মানবপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার কাছেও তথ্য রয়েছে। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর র্যাব তাকে গ্রেফতার করে ৬ মাসের জন্য জেলহাজতে পাঠায়। এরপর সে জামিন নিয়ে বাইরে চলে আসে। এরপর দৈনিক যুগান্তরের অপরাধ বিভাগের প্রধান ও বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী নান্নুর স্ত্রী শাহিনা হোসেন পল্লবীর কথিত কর্মস্থলের (ইনফিনিটি মার্কেটিং লিমিটেডের) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সিরাজুল আমিন রুমেলের নাম উঠলে তিনি আবারও আলোচনায় চলে আসেন। বর্তমানে রুমেল পলাতক রয়েছেন।

আরও পড়ুন: ‘সাংবাদিক নান্নু হত্যার পিছনে মাস্টারমাইন্ড ছিলেন রুমেল’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here