‘সাংবাদিক নান্নু হত্যার পিছনে মাস্টারমাইন্ড ছিলেন রুমেল’

498
সিরাজুল আমিন রুমেল
সিরাজুল আমিন রুমেল

দৈনিক যুগান্তরের অপরাধ বিভাগের প্রধান ও বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী নান্নুর স্ত্রী শাহিনা হোসেন পল্লবীর কথিত কর্মস্থলের (ইনফিনিটি মার্কেটিং লিমিটেডের) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সিরাজুল আমিন রুমেল। পুলিশের তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছে।

নান্নু হত্যা পরবর্তী মামলার বাদী নান্নুর বড় ভাই নজরুল ইসলাম খোকন এজাহারে সিরাজুল আমিন রুমেলের বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করেন। মামলার সূত্র ধরে তদন্তে নামলে জানা যায় নান্নু হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী সিরাজুল আমিন রুমেল। স্ত্রী পল্লবীর ইন্ধনে রুমেল পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড করেছে বলে উল্লেখ করছে তদন্ত কমিটি।

ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্তে নেমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা চমকপ্রদ তথ্য পাচ্ছেন। জানতে পেরেছেন তার বিপুল সম্পদ ও তার স্ত্রীর রেখে যাওয়া জীবনের কাহিনী।

নান্নুর রহস্যঘেরা মৃত্যুর পর পুলিশের গুলশান বিভাগ, বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন (ক্র্যাব), ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ পৃথক পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে। তারা সমন্বয় করে কাজ করছেন।

ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ও সিআইডি ফরেনসিক আলামত সংগ্রহ করেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা এ পর্যন্ত প্রাপ্ততথ্যে নান্নুর মৃত্যু দুর্ঘটনাজনিত নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে জানতে পেরেছেন। সেইসঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কেও তারা বেশ কিছু তথ্য পেয়েছেন। বাব-পুত্রের মৃত্যুর সঙ্গে মিলেছে যোগসূত্র। শিগগিরই তদন্ত কমিটিগুলো তাদের প্রতিবেদন দাখিল করবে বলে সংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে হত্যারহস্য উদ্ঘাটনে ময়নাতদন্তের জন্য কবর থেকে লাশ তোলা হবে। হত্যা মামলার বাদী নান্নুর বড় ভাই নজরুল ইসলাম খোকন লাশ উত্তোলনের জন্য তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করেছেন। তদন্তের প্রয়োজনে নান্নুর পুত্র পিয়াসের লাশও কবর থেকে উত্তোলন করা হতে পারে বলে জানা গেছে। তবে এখনো আটক হয়নি নান্নুর স্ত্রী শাহিনা হোসেন পল্লবী, শাশুড়ি শান্তা পারভেজ ও পল্লবীর কথিত কর্মস্থলের মালিক সিরাজুল আমিন রুমেল। তাদের ধরতে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। বাড্ডা থানা থেকে যশোর পুলিশকে এ ব্যাপারে অবগত করা হয়েছে।

পুলিশের তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অনেক বিষয় জড়িত। তার স্ত্রী শাহিনা হোসেন পল্লবীর কথিত কর্মস্থলের কর্ণধার সিরাজুল আমিন রুমেল আদম ব্যবসায় (জনশক্তি রপ্তানি) জড়িত। তিনি মালায়শিয়া, লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশে মানবপাচারে জড়িত বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। বাড্ডা শাহজাদপুর এলাকায় তার অফিস রয়েছে। তার অনেক অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নান্নু দম্পতির নাম।

নান্নুকে হাসপাতালে নেয়ার পর সবাইকে আড়াল করে সবকিছু তদারকি করেন রুমেল। এমনকি লাশ ময়নাতদন্ত না করে নিজের গাড়িতে যশোরে নিয়ে দাফনের তদারকিও করেন তিনি। নান্নুর স্বজন ও সহকর্মীদের ছাপিয়ে তার তৎপরতায় শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ। গুঞ্জন রয়েছে, রুমেলের দেহরক্ষীর সঙ্গেও পল্লবীর সখ্যতা ছিল। তারও যাতায়াত ছিল পল্লবীর ফ্ল্যাটে। নান্নু অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পরদিন সকালে রুমেলের কালো প্রাডো (ঢাকা মেট্রো-ঘ ১১-৯৩৯২) গাড়িটি ছিল আফতাবনগরের ফ্ল্যাটের নিচে।

ক্র্যাবের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নান্নু ও তার স্ত্রীর নামে ঢাকা ও যশোরে বিপুল সম্পদ রয়েছে। আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিবিহীন সম্পদ অর্জনে নান্নু ও তার স্ত্রী একযোগে কাজ করতেন। বেশির ভাগ লেনদেনের সঙ্গে তার স্ত্রী জড়িত ছিলেন। তার স্ত্রী কারওয়ান বাজারসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকা দিন-রাত চষে বেড়াতেন। মোহাম্মদপুর এলাকায়ও তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। নিয়মিত মদ্যপান করতেন। তাদের ফ্ল্যাটেও পার্টি হতো।

পল্লবীর নিম্নবৃত্ত পরিবারে জন্ম নিলেও বিয়ের পর ঢাকায় তার জীবনযাপন ছিল বেপরোয়া। পুলিশসহ সমাজের অনেক প্রভাবশালীর সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। অনেকের সঙ্গে তার সম্পর্কে গড়ে ওঠায় নান্নু হয়ে পড়েছিলেন অসহায়। একপর্যায়ে নান্নু সবকিছু স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়। মায়ের বেপরোয়া আচরণে একমাত্র ছেলে বিমর্ষ হয়ে পড়েন। যার অনেক কিছু তিনি (স্বপ্নীল আহমেদ পিয়াস) মেনে নিতে পারছিলেন না। এ নিয়ে প্রায়ই বাসায় কলহ হতো।

একমাত্র সন্তানের মৃত্যুর পর নান্নু তার সমস্ত সম্পত্তি বিক্রি করে বৃদ্ধাশ্রম, এতিমখানা ও ট্রাস্ট করার চিন্তা করছিলেন। এ নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে তার বনিবনা হচ্ছিল না। মূলত বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি কবজা করতেই সিরাজুল আমিন রুমেলকে সঙ্গে নিয়ে এ হত্যাকাণ্ড বলে মনে করছে পুলিশ।

এ প্রসঙ্গে বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মূল পরিকল্পনাকারীর তথ্য আমাদের হাতে রয়েছে। শিগগির এ বিষয়ে আমরা বিস্তারিত জানাতে পারবো।

ইনফিনিটি মার্কেটিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সিরাজুল আমিন রুমেলের বিষয়ে অধিকতর তদন্ত করতে গিয়ে জানা গেছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে মানব পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর র‍্যাব তাকে গ্রেফতার করে ৬ মাসের জন্য জেলহাজতে পাঠায়। এরপর সে জামিন নিয়ে বাইরে চলে আসে। মানবপাচার ছাড়াও মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসা করে সে কয়েকশত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। তার নামে চেক জালিয়াতি, আদমপাচার, অর্থ আত্মসাতসহ বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। ২০০৪ সালের বহুল আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার আসামি ও শিবির নেতা পেয়ার আহমেদ আকাশের সাথেও সিরাজুল আমিন রুমেলের সখ্যতা রয়েছে বলে জানা গেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here