তথ্যপ্রযুক্তি খাতের নতুন প্রতারক আমান উল্লাহ চৌধুরী

908
আমান উল্লাহ চৌধুরী
আমান উল্লাহ চৌধুরী

তাহসান আশিক, ডেইলি ঢাকা টাইমস: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ‘অ্যামাজন’ বাংলাদেশে কোনো প্রকার কার্যক্রম শুরু না করলেও একটি চক্র প্রতিষ্ঠানটির নামে প্রতারণা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে চক্রটি রেজিস্টার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ (আরজেসি) থেকে ‘অ্যামাজন বাংলাদেশ’ নামটি তালিকা ভুক্ত করেছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ব্যবসা করতে চাইলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি নেয়ার নিয়ম থাকলেও এই দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছে অ্যামাজনের বাংলাদেশ কার্যক্রম সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই।

কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য না থাকলেও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ই-কমার্স কোম্পানি অ্যামাজনের নামে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু হলে বড় ধরনের প্রতারণা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্ডার দেয়া পণ্য না পাওয়া এবং অনলাইনে পেমেন্টের টাকা বেহাত হতে পারে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। অতীতে বেশ কয়েকটি দেশে অ্যামাজনের নাম ব্যবহার করে এমন প্রতারণার নানান অভিযোগ অনলাইন ফোরাম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে দেখা যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আমান উল্লাহ চৌধুরী নামে একজন ব্যক্তি জয়েন্ট স্টক থেকে ‘অ্যামাজন বাংলাদেশ লিমিটেড’ নামটি তালিকা ভুক্ত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়াও বিভিন্ন জাগায় তিনি নিজেকে অ্যামাজন বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিচয় দিয়ে থাকেন। অ্যামাজন-বিডি (amazon-bd.com) নামে একটি ডোমেইনও কিনেছেন তিনি। সেই ডোমেইন অ্যামাজনের মূল সাইটের সঙ্গে রিডিরেক্ট (ক্লিক করলে মূল সাইটে চলে যাবে) করে রেখেছিলেন। এখন সেটা সরাসরিই চালাচ্ছে। অ্যামাজনের পলিসি অনুযায়ী তাদের ডোমেইনের মালিকানা লেখা থাকে অ্যামাজন টেকনোলজিসের নামে। আর অ্যামাজন-বিডির ডোমেইনের মালিকানা দেখাচ্ছে অ্যামাজন বাংলাদেশ লিমিটেডের নামে।

অ্যামাজন বাংলাদেশ
অ্যামাজন বাংলাদেশ

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ই-কমার্স সাইট বাংলাদেশে চালুর বিষয়টি সরকারের কোনো মহলই জানেন না। এমনকি যিনি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দাবি করছেন তাকেও খাত সংশ্লিষ্টরা কেউই চিনছেন না। বাংলাদেশে ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) এর অর্থ সম্পাদক আব্দুল হক অনু বলেন, বাংলাদেশে অ্যামাজন আসার বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো খবর নেই।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার এই খাতের সকল খবর রাখলেও অ্যামাজন বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করছে কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি জানান, ‘আমার এ বিষয়ে জানা নেই। এছাড়া আমাদের কাছে আবেদন করারও কিছু নেই। এ বিষয়ে জানলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বিডা জানতে পারে।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু বিষয়ে কাজ করে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) সেল। ডব্লিউটিও সেলের মহাপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা এখনও বাংলাদেশে ব্যবসা করার জন্য অ্যামাজন থেকে কোনো ধরনের আবেদন পাইনি। স্থানীয়ভাবেও কেউ আবেদন করেনি। তবে দুই মাস আগে বাংলাদেশের পণ্য বিদেশে বিক্রি করার বিষয়ে আলাপ করতে ভারত থেকে একটি প্রতিনিধি দল এসেছিল। তবে তারা এ দেশে পণ্য বিক্রি করার বিষয়ে কোনো আলাপ করেনি।’

এদিকে বিদেশি যে কোনো বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এর অনুমতি নেয়া অত্যাবশ্যকীয়। বাংলাদেশে ই-কমার্স খাতে বিনিয়োগের বিষয়টি দেখেন বিডার পরিচালক মো. আরিফুল হক। তিনি জানান, ‘ই-কমার্সে ব্যবসা করার জন্য আলিবাবা দারাজ বাংলাদেশে বিনিয়োগ করলেও অ্যামাজন আমাদের সঙ্গে কোনোরকম আবেদন বা বিনিয়োগ করেনি। এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্যও নাই।’

বাংলাদেশে কর্তৃপক্ষের কাছে অ্যামাজনের বিষয়ে কোনো তথ্য না থাকলেও আমান উল্লাহ চৌধুরী নিজেকে অ্যামাজন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলে দাবি করছে কেন? এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) এর একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘একটি বিদেশি কোম্পানির নাম বাংলাদেশে রেজিস্ট্রেশন করে রাখার উদ্দেশ্য হচ্ছে ভবিষ্যতে ওই কোম্পানি দেশে কার্যক্রম শুরু করলে তাদেরকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে নামের হস্তান্তর করতে হবে। আমরা আগেও বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম ভাঙিয়ে এভাবে প্রতারণা করতে দেখেছি। আমরা নিজেরাও এ বিষয়ে উদ্যোগী হয়ে সমাধান করেছি।’

অ্যামাজন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক দাবিদার আমান উল্লাহ চৌধুরী নিজেও স্বীকার করেছেন প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে তাদেরকে কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়নি। তিনি বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে তাদের পুরোপুরি আনুষ্ঠানিকতা হয়নি। কোভিডের কারণে অ্যামাজনের লোকজন বাংলাদেশে আসতে পারেনি। তারা সার্ভে করে গেছে। সব কিছু কমপ্লিট। বাংলাদেশের অপারেশন যেহেতু আমরা দেখবো তাই তারা অ্যাপ ইস্যুসহ কিছু ফিল্ড ওয়ার্ক দিয়েছে; সেগুলোর আমরা কাজ করছি।’

ফেসবুকে নিজেকে অ্যামাজন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক দাবি করে থাকেন এই প্রতারক
ফেসবুকে নিজেকে অ্যামাজন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক দাবি করে থাকেন এই প্রতারক

অ্যামাজন থেকে এখানে কাউকে নিয়োগ দেয়া না হলেও বাংলাদেশে অ্যামাজনের অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করছে এমন ১৮ সদস্যের একটি টিম এখানে রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এছাড়া সরকার পর্যায়ে বাংলাদেশে অ্যামাজন আসার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলেই রেজিস্টার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজে অনুমোদন দিয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

অ্যামাজন কি আপনাদের এখানে নিয়োগ দেবে নাকি পার্টনারশিপে অ্যামাজনের ব্যবসা করবেন? উত্তরে তিনি বলেন, ‘নিয়োগপ্রাপ্ত না, বাংলাদেশে অ্যামাজনের অপারেশন আমরা চালাবো। আমাদের তারা নিয়োগও দেবে না আবার বেনিফিটও দেবে না। আমাদের ইনকাম আমাদেরকেই জেনারেট করতে হবে। তিন থেকে পাঁচ বছর আমাদের পরিচালনা করার জন্য দেবে। আমরা এই সময়ের মধ্যে সব কিছু ঠিক মত করতে পারলে একটা দাম ধরে বা আমাদের একটা শেয়ার দিয়ে তারা এটা টেক অভার করে নেবে।’

শেষ পর্যন্ত অ্যামাজন যদি আপনাকে বাংলাদেশে ব্যবসা করার অনুমতি না দেয় তাহলে আপনি যে নিজেকে অ্যামাজন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দাবি করছেন সেটার কী হবে? উত্তরে আমান উল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আমার সঙ্গে একটি লেয়াজু করে আমাকে বসিয়ে দিয়ে তারপরে এটা করতে হবে। অন্যথায় অ্যামাজন বাংলাদেশ নামে তারা ব্যবসা করতে পারবে না। অন্য নামে আসতে হবে। কারণ আমাকে আরজেসি থেকে রেজিস্ট্রেশন দিয়ে দিয়েছে। একই নামে তো দুইটা কোম্পানি চলবে না।’

আপনি বলছিলেন অ্যামাজন আপনাদের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়নি, তাহলে আরজেসিতে নাম তালিকাভুক্ত করলেন কেন? এমন প্রশ্নের সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি। লিখিত কোনো চুক্তি হয়েছে কিনা? উত্তরে তিনি বলেন, এমন কিছু হয়নি এসব মেইলে মেইলে আলাপ হয়েছে। তবে মেইলে কী আলাপ হয়েছে সে বিষয়ে বলতে তিনি রাজি হননি।

Read more: Let online learning be not a tool for faking inquisitiveness

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here